Search

Suggested keywords:

শুধু ফুটবলের জন্য সব কিছু করতে পারে অর্ণেন্দু

শুধু ফুটবলের জন্য সব কিছু করতে পারে অর্ণেন্দু

আর সব ছেলের মতোই পাড়ার মাঠে খেলেই শুরু হয়েছিল ক্যারিয়ার। বারুইপুর হাই স্কুলে পড়ত ছেলেটি। স্কুলে একদিন তার খেলা দেখে বন্ধু বলল, চল, এক জায়গায় প্র্যাকটিসে  যাবি? কোন জায়গা? সাউদার্ন স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন। ঢাকুরিয়া লেকের মাঠ। বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য, সঞ্জয় সেন, কম্পটন দত্তরা যেখানে আসেন। গেল ছেলেটি। ছোটদের তখন সেখানে দেখতেন বিজয় সাহা এবং সেখান থেকেই বি সি রায় ট্রফির বাংলা দলে চান্স পায় ছেলেটি। কোচ ছিলেন অকালেই আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়া শ্রদ্ধেয় সুজিত চক্রবর্তী। সম্ভবত মধ্যপ্রদেশে হয়েছিল টুর্নামেন্ট। সেমিফাইনালে হেরে যায় বাংলা।


জুনিয়র বেঙ্গল খেলে এসে ময়দানে পা রাখা। প্রথম ক্লাব উয়াড়ি। তারা তখন ফার্স্ট ডিভিশনে খেলছে। প্রথম বছরে একটাও ম্যাচে সুযোগ পায়নি সেই ছেলে। উয়াড়ি থেকে ইস্টার্ন রেল। সুযোগ মিলল না সেখানেও। এবং এই সময়ে কোভিড আতঙ্ক গ্রাস করল পুরো পৃথিবীকে। ছেলেটির ফুটবল ক্যারিয়ারেও পড়ল কোভিডের গ্রাস। বাবা তেমন কিছু করতেন না, ছেলেটির দাদাই চালাতেন সংসার। দাদা এবার সরাসরি বললেন, আমি একা পারছিনা, এবার তুইও রোজগার কর। ফুটবল খেলে কিছু হবে না। মানতে নারাজ ছেলেটি। ফুটবল ছাড়ার কথা সে ভাবতেই পারেনা। প্রায় টিন এজে তখন, ফুটবলের জন্য বাড়ির অন্য সবার থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সে। 


পাড়ার এক দাদা, শুভেন্দু রায়চৌধুরী, তার কাছে গিয়ে কাতর আর্জি জানাল ছেলেটি-- আমাকে বছর দেড়েকের জন্য আর্থিকভাবে একটু সাহায্য করতে পারবে? করেছিলেন শুভেন্দু বাবু। বাড়িতেই থাকে কিন্তু আলাদা রান্না করে খায় ছেলেটি। নিজের খরচ নিজেকেই চালাতে হয়। রীতিমতো কোণঠাসা আর প্রায় একঘরে! শুধু ফুটবলের জন্য। এইসময় মালবাজারে কলকাতা কাস্টমসের হয়ে একটা টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিল ছেলেটি। বেশ ভালো খেলল। কিন্তু কলকাতা লিগে কাস্টমসে খেলা হল না।ভবানীপুরে সই করল ছেলেটি। ভবানীপুরের কোচ তখন শঙ্করলাল চক্রবর্তী। গোলকিপার কোচ " রূপকদা। " তৃতীয় গোলকিপার হিসাবে তাকে সই করালো ক্লাব। প্রথমদিকে যথারীতি কোনো সুযোগ নেই। একদম শেষের দিকে সুযোগ পেল ছেলেটি। প্রতিপক্ষ মহামেডান। জিতল ভবানীপুর। দারুণ খেলল ছেলেটি। 


পরের বছর বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য কাস্টমসের কোচ হলেন। দলে নিলেন ছেলেটিকে। এইসময় একটি ভুল করল ছেলেটি। লিগ চলাকালীন বাইরে খেলতে গেল। তখনও নিজের খরচ নিজেই চালাতে হয় তাকে। তাই কিছু টাকার জন্যই বাইরে খেলতে যাওয়া। কিন্তু খেলতে গিয়েই বিপর্যয়। হাত ভাঙল। ২০২২ সাল সেটা। নিজের ভুল উপলব্ধি করল ছেলেটি। এর পরে একটা ভালো ঘটনা ঘটল ছেলেটির জীবনে। অ্যাডামাসে ভর্তি হয়েছিল সে। রঞ্জন ভট্টাচার্যের কোচিংয়ে  খেলো ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি গেমসে সোনা জিতল অ্যাডামাস। এবং ২০২৪ এ অল ইন্ডিয়া ইন্টার ইউনিভার্সিটিতে তৃতীয় হল তারা। এই " নর্মস " এর কারণেই চাকরিও পেয়ে গেল ছেলেটি। মেট্রো রেলে। ২০২৬ সালে। 


২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ ---  টানা চার বছর কাস্টমসেই আছে ছেলেটি। এবার ছেলেটির নামটা বলা যাক আপনাদের। ওর নাম অর্ণেন্দু দত্ত। গোলকিপার অর্ণেন্দু দত্ত। গত তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে কলকাতা লিগে ভালো খেলে চলেছে সে। গত কয়েক বছরে তার দল কাস্টমস ধারাবাহিক ভালো খেলছে। গত বছরে একসময় এমন অবস্থা ছিল যে শেষ চারটে ম্যাচ দারুণ খেলতে হত সুপার সিক্সে যেতে গেলে। এবং কাস্টমস সুপার সিক্সে যায়। অর্ণেন্দু অনবদ্য ছিলেন। 


শুধু ফুটবলের জন্য পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েছিল বারুইপুরের অর্ণেন্দু। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে অভিভাবকদের কোনো দোষ ছিল না। রোজগার করাটা জরুরি ছিল। কিন্তু অর্ণেন্দু ফুটবল ছাড়ার কথা ভাবতেই পারে না। এবং ফুটবল দেবতা তার পুরস্কার দিয়েছেন। চাকরি পাওয়ার পরে অর্ণেন্দু আরো " ফোকাসড "। এ বছরেও হয়তো পুরনো ক্লাব কাস্টমসেই দেখা যাবে তাকে। লক্ষ্য রাখুন আসন্ন কলকাতা লিগে এক হার না মানা তরুণের দিকে যে ফুটবলের জন্য সব কিছু ছেড়ে দিতে রাজি! 


কে বলে যে কলকাতা ফুটবল লিগ আর নতুন কোনো গল্প লেখে না?

Powered by Froala Editor