ব্যারাকপুর রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মিশন। ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত সেখানেই পড়াশোনা। কিন্তু পড়াশোনার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল ফুটবল। তাঁর ফুটবল জীবনের ভিত যে ব্যারাকপুরের রামকৃষ্ণ মিশন থেকেই শুরু তা মানেন দেবজিৎ। দেবজিৎ মানে দেবজিৎ বসাক। ক্লাস ফাইভ -- সিক্স থেকে ফুটবলটাকে আঁকড়ে
ধরলেন তিনি। স্কুলের কোচ তখন স্বনামধন্য প্রাক্তন ফুটবলার এবং কোচ রঞ্জিত মুখার্জী। ময়দান একসময় " গোল মেশিন " বলত খড়দহের রঞ্জিত মুখার্জীকে। দেবজিতের সঙ্গেই পড়তেন কলকাতা মাঠের আরেক তরুণ প্রতিভা --- শেখ সাহিল। মোহনবাগানে খেলা এই তরুণ ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভ পর্যন্তই পড়েছেন দেবজিতের সঙ্গে।
রঞ্জিত মুখার্জীর হাত ধরেই জেলা ফুটবলে আসা। রহড়া সংঘ, জেলার ঐতিহ্যশালী ক্লাব, তাদের হয়ে আন্ডার সেভেন্টিন ফুটবল টুর্নামেন্টে খেললেন দেবজিৎ। এরপর উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হয়ে বয়সভিত্তিক আন্ত --জেলা ফুটবলে অংশ নেওয়া। সেখানে কোচ ছিলেন বুদ্ধ স্যার। সেই lর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন দেবজিৎ। এর পর ২০১৯ সাল। দেবজিতের ফুটবল জীবনের মোড় ঘোরানো বছর বললে খুব একটা ভুল বলা হবে কি?আন্ডার নাইন্টিন একটা ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করল জি বাংলা। সারা রাজ্য থেকে নাম করা ক্লাবগুলো অংশ নিল। সেমিফাইনালে উঠল --- মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, এরিয়ান এবং....। এবং উত্তর চব্বিশ পরগনা। জেলা দল হিসাবে একমাত্র তারাই উঠেছিল সেমি ফাইনালে। উত্তর চব্বিশ পরগনার এই আন্ডার নাইন্টিন দলটার অধিনায়কের নাম ছিল দেবজিৎ বসাক। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ছিলেন রঞ্জন ভট্টাচার্য। এখান থেকেই গুরু -- শিষ্যর একসঙ্গে পথ চলা শুরু। রঞ্জন ভট্টাচার্য -- দেবজিৎ বসাক! যদিও সেমিফাইনালে মোহনবাগানের কাছে হেরে যায় চব্বিশ পরগনা কিন্তু দেবজিৎ যে আসছেন বঙ্গ ফুটবলের আঙিনায় তার ঘোষণা করে দিয়েছিল জি বাংলার ওই টুর্নামেন্ট।
কে দেবজিৎ বসাক? পাঠকদের একটু বলে দেওয়া যাক এখানেই। গত বছর কয়েক ধরেই প্রিমিয়ারে যাঁরা সীমাহীন প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছেন, সেই বাঙালি উঠতি ফুটবলারদের অন্যতম একজন দেবজিৎ। সুখচর ইউনিয়ন ক্লাবের মাঠের লাগোয়া বাড়ি দেবজিৎদের। বাবা -- মায়ের একমাত্র সন্তান দেবজিৎ। রঞ্জন ভট্টাচার্য দেবজিতকে ধরলেন এখান থেকেই। অ্যাডামাস ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হল দেবজিৎ। ২০১৯ -- ২০ সন্তোষ ট্রফিতে বাংলা দলের কোচ হয়েছিলেন রঞ্জন ভট্টাচার্য। সেই সময় সন্তোষ ট্রফির দলে তিনজন আন্ডার টোয়েন্টি ওয়ান প্লেয়ার নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। দেবজিতকে দলে রেখেছিলেন রঞ্জন। কল্যাণীতে হওয়া প্রাথমিক পর্ব থেকে কোয়ালিফাই করে বাংলা। কোভিডের কারণে সে বছর অবশ্য সন্তোষ ট্রফির চূড়ান্ত পর্বের খেলা হয়নি।
কলকাতা ময়দানে পা রাখাও তখন হয়ে গেছে দেবজিতের। ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাবের হয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে খেললেন। এবং এর পর আই লিগ টুও খেলে ফেললেন ছত্তিশগড়ের রামকৃষ্ণ মিশন অ্যাকাডেমির হয়ে। কোচ ছিলেন জহর দাস। এরপর আবার কলকাতায় ফেরা। সাউদার্ন সমিতির দায়িত্বে তখন সেই রঞ্জন ভট্টাচার্য। অতএব দেবজিৎও সাউদার্নে গেলেন। এবং সেখান থেকে সুরুচিতে। সেটাও সেই রঞ্জন স্যারের হাত ধরেই। গত দু মরশুম সুরুচিতেই খেলেছেন। সামনের মরশুমেও হয়তো সেখানেই থাকবেন। গত মরশুমে সি এফ এলে ছ -- ছটা গোল আছে দেবজিৎ বসাকের, পাঁচটা অ্যাসিস্ট, দুটো মান অফ দা ম্যাচ। মেসারার্স এবং ইউ কে এস সির বিরুদ্ধে ম্যান অফ দা ম্যাচের পুরস্কার পেলেও গত লিগ মরশুমে দেবজিতের স্মরণীয় ম্যাচটা কিন্তু ছিল পুলিশ এ সির বিপক্ষে। প্রথম অর্ধে দু গোলে পিছিয়ে ছিল সুরুচি। যাঁরা খেলা দেখেছেন তাঁরা জানেন যে পুলিশ এ সি গত মরশুমে কলকাতা লিগে দাপিয়ে ফুটবল খেলেছিল। সেই দলের বিরুদ্ধে প্রথম অর্ধে ০ -- ২ এ পিছিয়ে থেকেও ২ -- ২ ফলে ম্যাচ ড্র করে সুরুচি। এবং প্রথম গোলটা শোধ করার ক্ষেত্রে দেবজিতের অবদান ছিল। তাঁকে বক্সের মধ্যে ফাউল করায় সুরুচি পেনাল্টি পায়। পুরো দ্বিতীয় অর্ধ জুড়েই ঝড় তোলেন তিনি।
উইংয়ের খেলোয়াড় দেবজিৎ। এখনকার ফুটবলের ভাষায় উইং হাফ। দুদিকেই সমান স্বচ্ছন্দ। দেবজিতের মূল অস্ত্র তাঁর গতি। গতি এবং গতির ওপর ছোট ছোট ডজ। আরেকটা অস্ত্র হল তাঁর " পিন পয়েন্ট ক্রস ডেলিভারি। " কিন্তু এর বাইরেও আরেকটা জিনিস রয়েছে যা দেবজিতকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। সেটা হল তাঁর গোল করার প্রবণতা। একজন উইং হাফের ছটা গোল করা থেকেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়। দুর্বলতা? সেটাও অবশ্যই আছে। সেগুলো নিয়ে গুরু রঞ্জন ভট্টাচার্যের সঙ্গে রোজই কথা হয়।
ভারতীয়দের মধ্যে সব থেকে প্ৰিয় খেলোয়াড় মনবীর সিং। আর আন্তর্জাতিক আঙিনায় দেবজিতের আইডলের নাম কিলিয়ান এম্বাপে। বড় দলে খেলার স্বপ্ন দু -- চোখে। খুব চান আই লিগের যে কোনো একটা ক্লাব ডাকুক তাঁকে। সাফ কথা দেবজিতের, একটা সুযোগ দিয়ে দেখুক কেউ, পারফর্ম করতে না পারলে একটা টাকাও নেব না। এবং দেবজিৎ মনে করেন বাঙালি ছেলেরা প্রতিভায় পিছিয়ে নেই , পিছিয়ে আছে এজেন্ট -- যোগের ক্ষেত্রে। নিজের গুরু রঞ্জন ভট্টাচার্যকে নিয়েও সরব তিনি। বলছেন, স্যারের যা সাম্প্রতিক সাফল্য তাতে তাঁর কি আই লিগের কোনো ক্লাবের দায়িত্ব পাওয়া উচিত নয়? প্রশ্ন তুলছেন দেবজিৎ। এখনো পর্যন্ত ফুটবল খেলে যতটুকু প্রাপ্তি তাঁর, তাতে রঞ্জন স্যারের অবদান। প্লেয়ার্স কোটায় চাকরি পেয়েছেন নর্থ -- ইস্ট -- ফ্রন্টিয়ার রেলে। ২০২৪ সালে।
কলকাতা থেকে অনেক দূরে আসামের কামাখ্যা রেল স্টেশনে চাকরি করে এক ছেলে। চাকরি করে এবং বিনা বেতনের ছুটি নিয়ে এসে কলকাতা লিগ খেলে যায়। কারা যেন বলেন বাঙালি ফুটবলাররা চাকরি পেলেই আত্মতুষ্টিতে ভোগে? তাঁরা এই ছেলের দিকে তাকান। চাকরি বরং আর্থিক নিরাপত্তা জুগিয়ে আরো শক্তিশালী করেছে এই ছেলেকে। কলকাতা থেকে দূরে থেকেও জিম, ফিজিক্যাল ট্রেনিং, ডায়েট সব কিছুর মধ্যে দিয়ে নিজেকে তৈরি রাখছে দেবজিৎ।
একটা, শুধু একটা সুযোগ চান সুখচরের দেবজিৎ বসাক, উত্তরণের একটা পথ। সেই পথের সন্ধান কি তাঁকে দেবেন ফুটবল ঈশ্বর? উত্তর নিহিত আছে ভবিষ্যতের গর্ভে।




Powered by Froala Editor
