পৈলান স্বামীনারায়ণ মন্দিরের বেশ নাম এখন। অনেক লোকেই যান সেখানে আজকাল দেবতা -দর্শনে। সেখান থেকে খুব জোর পনেরো -- কুড়ি মিনিটের পথ আমতলা। হ্যাঁ, বাস স্টপেজের নামটা আমতলা। ওখানেই অমিত বসাকের বাড়ি। কে অমিত বসাক? অমিত বসাককে বলা যেতে পারে গত কলকাতা লিগের সুপার -- সাব। ইউনাইটেড স্পোর্টস গত কলকাতা লিগের রানার আপ। এবং তার পিছনে অমিতের বড় অবদান আছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই পরে মাঠে এসেছেন অমিত। এবং বাজিমাত করেছেন।
পঞ্চম ডিভিশন দিয়ে ফুটবল শুরু অমিতের তারপর ধাপে, ধাপে ওপরে ওঠা শুরু। জানবাজার, ইয়ং কর্নার -- এর মতো কলকাতার চেনা ক্লাবগুলোতে খেলেছে অমিত আর স্বপ্ন দেখেছে। কী স্বপ্ন? ইউনাইটেড স্পোর্টসে খেলার স্বপ্ন। এমনিতে অমিত ঘোর ইস্টবেঙ্গল -- ভক্ত। কিন্তু ইউনাইটেডে খেলা তার বহুদিনের স্বপ্ন। ইউনাইটেড যে একটা মঞ্চ আরো ওপরে ওঠার, আরো ভালো জায়গায় খেলার। এবং আমতলার অমিত বসাক আমাদের ছোটবেলায় পড়া সেই গল্পের কথা মনে করায়। সেই যে রবার্ট ব্রুস আর মাকড়সার জাল বোনার গল্প। বারবার ব্যর্থ হচ্ছে মাকড়সাটা, পড়ে যাচ্ছে নীচে, তাও হাল ছাড়ছে না। অমিতের গল্পটাও একদম ওইরকম। চার বার ইউনাইটেডের ট্রায়ালে এসেছে সে এবং ব্যর্থ হয়েছে। কোচেদের তাকে পছন্দ হয়নি। কিন্তু অমিত হাল ছাড়েনি।
এবং শেষ পর্যন্ত ইউনাইটেডের বেগুনি জার্সি গায়ে ওঠে অমিতের। পাড়ার নাইন -- এ -- সাইড মাঠ, সেখান থেকে বিষ্ণুপুর কোচিং সেন্টার। সেখানে কোচিং করাতে আসতেন জয়ন্ত মিত্র। তিনিই অমিতকে ময়দানের রাস্তা চেনান। এবং ওই যে বললাম, পাঁচ বারের চেষ্টায় ইউনাইটেড। প্রথম বছরে মাত্র দুটো ম্যাচ খেলেছিল অমিত। পরের বছর অর্থাত গত মরশুমেও প্রথম দুটো ম্যাচে এমনকি রিজার্ভ বেঞ্চেও ছিল না সে। কিন্তু প্র্যাক্টিস ম্যাচে তার করা একটা গোল অমিতের জীবনের চাকা বদলে দেয়। গত মরশুমে পরিবর্ত খেলোয়াড় হিসাবে মাঠে নেমে সব থেকে " ইমপ্রেসিভ " ছিল অমিত। লিগে তিন -- চারটে গোল আছে অমিতের। সব থেকে সেরা গোলটা লিগের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে। ইস্টবেঙ্গল বনাম ইউনাইটেড স্পোর্টস। ইস্টবেঙ্গলের ড্র করলেও চলবে কিন্তু ইউনাইটেডকে লিগ চ্যাম্পিয়ন হতে গেলে জিততেই হবে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে প্রথম অর্ধে এক গোলে পিছিয়ে ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু দ্বিতীয় অর্ধে সেই " সুপার -- সাব " অমিত ম্যাচে ফেরায় দলকে। শ্রীনাথের মাইনাসটা দারুণ ফলো করেছিল সে। ইস্টবেঙ্গল ১ -- ইউনাইটেড স্পোর্টস ১! মাঠে মা -- বাবা হাজির, এরিয়ান গ্যালারিতে আর ছেলে সেই ক্লাবের বিরুদ্ধে গোল করছে যে ক্লাবে খেলা তার আল্টিমেট গোল! কলকাতা লিগ বর্ণময় হয়ে ওঠে অমিত বসাকদের স্বপ্ন -- সন্ধানের পথ ধরে। কলকাতা লিগ তার সেই আকর্ষণ নিয়েই হাজির এখনো। শুধু গল্পগুলো খুঁজে নিতে হয়।ম্যাচটা হারে ইউনাইটেড কিন্তু অমিত বসাক নামটা মনে গেঁথে যায়।
আরো একটা স্বপ্নের ম্যাচ। আই এফ এ অমিতের গোলেই গোকুলম কেরালাকে হারাল ইউনাইটেড, ম্যান অফ দা ম্যাচ অমিত। এবারে মাঠের নাম কল্যাণী, ইউনাইটেড স্পোর্টসের হোম গ্রাউন্ড। আর এবারেও মাঠে হাজির বাবা -- মা! সন্তোষ ট্রফির ট্রায়ালেও ছিল অমিত, শেষ মুহূর্তে বাদ পড়ে। কিন্তু বাদ পড়া অমিত বসাককে দমিয়ে দেয় না কোনোদিন। সে আবার উঠে দাঁড়ায়। ফিফথ ডিভিশন থেকে যে ছেলে ইউনাইটেড স্পোর্টসে এসেছে, যে ইস্টবেঙ্গলের মতো দলের বিরুদ্ধে গোল করেছে,সে ছেলে জানে অপ্রত্যাশিত বলে কিছু নেই এ দুনিয়ায়। ভগবান কার জন্য কী চিত্রনাট্য লিখে রেখেছেন কে জানে!
কলকাতা লিগের কাউন্টডাউন শুরু হবে কিছুদিন পর থেকেই। আমতলার ছেলে আবারও হয়তো বেগুনি জার্সিতে দৌড় শুরু করবে। তবে এবারের আসন্ন কলকাতা লিগে নিজের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া আছে অমিতের। " সুপার সাব " তকমাটা পছন্দ নয় তার। প্রথম দলে নিয়মিত ভাবে থাকা এবং গোল করা ---এই স্বপ্নই দেখছে আমতলার ছেলে। এবারের কলকাতা লিগের পরে হয়তো স্বামীনারায়ণ মন্দির দেখতে গিয়ে অমিত বসাকের বাড়ির খোঁজ করবেন ফুটবল -- পাগল মানুষ!
ট্রুথ ইস স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন!
এ কথা যে কতটা সত্যি তা আমতলার অমিত বসাকের থেকেও ভালো করে খুব কম জনই চেনে।
Powered by Froala Editor
