রাজু ওঁরাও, বাড়ি -- পায়রাগাছা, জেলা হুগলি। পায়রাগাছা থেকে নৈটির দূরত্ব খুব অল্পই। সেই নৈটিতে সেলুন আছে রাখালদার। ভদ্রলোক ফুটবল অন্তপ্রাণ। সেই রাখালদাই রাজুকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন নৈটি পঞ্চানন্দ স্পোর্টিং ক্লাবে। রাজুর বয়স তখন পনেরো -- ষোলো। এবং সেখানেই রাজু পেয়েছিল জয়সীমা পানকে। জয়সীমা পান, রাজুর দ্রোণাচার্য।রাখালদা, জয়সীমা পান এবং নৈটির মিঠুদা -- এই তিনজনকে ভুলতে পারেনা রাজু। তার জীবনে এঁদের অবদান অসীম। পঞ্চানন্দ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলা তো চলছিলই, এর পাশাপাশি কলকাতা ময়দানেও পা রাখল রাজু। ফার্স্ট ডিভিশনের সালকিয়া ফ্রেন্ডস হল ময়দানে রাজুর প্রথম ক্লাব। এক বছর সালকিয়াতে খেলার পর রাজু গেল এফ সি আইয়ের ট্রায়ালে। কিন্তু সেখানে এক সপ্তাহ ট্রায়াল দেওয়ার পরেও ক্লাব তাকে ইতিবাচক কিছু বলে নি, রাজু বুঝতে পারছিল এখানে সে সুযোগ পাবে না। পাশের মাঠেই রেলওয়ে এফ সির ট্রায়াল চলছিল। রাজু যোগ দিল সেই ট্রায়ালেই। আদতে লেফট উইং হাফ রাজুকে একদিনেই পছন্দ করে নিয়েছিলেন রেলওয়ে এফ সি কোচ নীলাঞ্জন। লেফট উইং হাফ বা লেফট উইঙ্গার রাজু ডান দিকেও খেলতে পারে অবলীলায়।
এক বছর রেলওয়ে এফ সিতে খেলল রাজু, গোলও করল। পরের বছর এরিয়ান। সেখানেও গোল এবং অ্যাসিস্ট দুটোই ছিল তার, প্রথম বছরে।এবং এই পর্যন্ত সাধারণ ফুটবলপ্রেমী দর্শক রাজু ওঁরাওকে সে ভাবে চিনত সে কথা বলা যাবে না। গতবছর এরিয়ানের কোচ ছিলেন রঞ্জন চৌধুরী। এবং প্রথমের দিকে পরপর হারছিল দল, রাজুও একটা ম্যাচেও সুযোগ পাচ্ছিল না। অবশেষে ভবানীপুর ম্যাচে সুযোগ পেল রাজু। ততদিনে রঞ্জন চৌধুরী এরিয়ানের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। রাজুর করা ওই এক গোলেই তিন পয়েন্ট তুলল এরিয়ান।
এবং কী অবস্থায় ওই ম্যাচ খেলেছিল রাজু? বাবা মারা গেছেন, " কাছা " নিয়ে ওই ম্যাচ খেলে সে, গোল করে এবং তিন পয়েন্ট এনে দেয়। এর ঠিক কয়েকদিন আগেই পাঠচক্র গোলকিপার অর্ণব দাস এই একই ঘটনা ঘটিয়েছে।অর্ণবের ক্ষেত্রে চলে গিয়েছিলেন মা। অর্ণব ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে গোল বাঁচিয়ে তিন পয়েন্ট এনে দিয়েছিল ক্লাবকে। রাজু গোল করে এনে দিল তিন পয়েন্ট। রাজু স্বীকার করেছিল যে অর্ণবের ঘটনাটা তাকে প্রেরণা দিয়েছিল। বাবা -- মাকে আনন্দ দেওয়া একটা বড় লড়াই ছিল রাজুর। ইঁট -- সিমেন্টের সদ্য বানানো বাড়িটায় প্লাস্টার করা যায়নি তখনও। এই অবস্থাতে চলে গেলেন বাবা। চোখে জল আর বুকে আগুন নিয়ে সেদিন ভবানীপুরের বিপক্ষে নেমেছিল পায়রাগাছার রাজু ওঁরাও।
এবং তারপরেও যে রাজুর ফার্স্ট ইলেভেনে নিয়মিত জায়গা হচ্ছিল এমনটা নয়। ভবানীপুর ম্যাচের ম্যান অফ দা ম্যাচ রাজু আবার নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করল সি এফ এলের শেষদিকে। এরিয়ানের সামনে তখন রেলিগেশনের ভ্রূকুটি! আবারও গোল করল রাজু, আবারও দল পেল তিন পয়েন্ট। রেলিগেশন বাঁচল।
রাজু এবার এরিয়ান ছেড়ে পিয়ারলেসে। নতুন দল, নতুন স্বপ্ন। ব্যক্তিগতভাবে রাজু মনে করে সামনের সি এফ এলটা তার কাছে " এবার না হলে নেভারের " লড়াই! কী রকম? বয়স বাড়ছে রাজুর। অতএব এখনই সময় ভালো পারফর্ম করে বড় দলে যাওয়ার। আর তার জন্য সি এফ এলে ভালো খেলতে হবে। অ্যাসিস্ট করতে হবে, গোল করতে হবে। হ্যাঁ গোল করার একটা সহজাত প্রবণতা আছে রাজুর। গোলের গন্ধ পায় সে!
রোজ স্বপ্নে বাবার সঙ্গে কথা হয় রাজুর। ঘরটা প্লাস্টার করা হয়নি এখনো, ঢালাই করাও হয়নি। সি এফ এলের তিন মাস বাদ দিলে ফুটবলার রাজু ওঁরাও হয়ে যায় টাইলস মিস্ত্রি। কিন্তু রাজু ফুটবলটাই খেলতে চায় সারা বছর। একটা বড় ক্লাব, সারাবছর নিশ্চিন্ত উপার্জন আর সারা বছর ফুটবল। বাবাকে দেওয়া গেল না সবটুকু,কিন্তু মা তো আছেন এখনও। মায়ের জন্য রাজুর লড়াই চলছে, চলবে। বাবার মুখটা খুব মনে পড়ে রাজুর। আর দু চোখ জলে ভরে যায় তখন। ভবানীপুর ম্যাচেও তাই হয়েছিল। কিন্তু দু চোখে জল নিয়েও ওই তেকাঠি, আর ওই জালটা পরিষ্কার দেখতে পায় রাজু। কোনো ভুল হয়না তার, বলটা ওই জালের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে।
Powered by Froala Editor
