Search

Suggested keywords:

খড়িবাড়ির ইনজামাম এখনো স্বপ্ন দেখে!

খড়িবাড়ির ইনজামাম এখনো স্বপ্ন দেখে!

ইনজামাম -উল - হক! না ইনি পাকিস্তানের সেই কিংবদন্তী ক্রিকেটার নিন, এই ইনজামাম আসলে আমাদের ঘরের ছেলে। জায়গাটার নাম খড়িবাড়ি, রাজারহাট থেকে আট কিলোমিটার মতো দূরত্ব খড়িবাড়ির। পাড়াতেই অন্য পাঁচ জন বন্ধুর সঙ্গে ফুটবল শুরু এই ইনজামামের। এই সময়ে খড়িবাড়িতে এলেন এক নতুন কোচ, যিনি রাজারহাট এবং খড়িবাড়ি দুটো জায়গাতেই ফুটবল শেখান। আমার এই গল্পের ইনজামাম সেখানে ফুটবল শিখতে শুরু করে। এবং সেখান থেকে ইস্টবেঙ্গল ফুটবল স্কুল। অক্টোবর ২০২৫ -- এ ইস্টবেঙ্গল স্কুল অফ ফুটবল এক্সেলেন্স প্রতিষ্ঠিত হয়, ফিলিক্স স্কুল অফ এডুকেশনের সঙ্গে যৌথভাবে। কিন্তু আমি যে ফুটবল স্কুলের কথা বলছি তা তখনো এত ঝাঁ -- চকচকে হয়নি। প্রাক্তন ফুটবলার তুষার রক্ষিত এবং কাজল ঢালি দায়িত্বে ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের সেই ফুটবল স্কুলের। ভর্তি হতে তিন হাজার আর মাসে মাসে দেড় হাজার টাকা লাগত এই ফুটবল স্কুলে ফুটবল শেখার জন্য। 


খড়িবাড়ির প্রান্তিক পরিবারের ছেলে ইনজামাম বুঝতে পারল তার পরিবার এইভাবে বেশিদিন টানতে পারবে না। তার সমস্যার কথা সে সরাসরি জানাল তার দুই কোচকে। তুষার রক্ষিত এবং কাজল ঢালি পরামর্শ দিলেন যে ইস্টবেঙ্গল আন্ডার টোয়েন্টি টিমটা বাইরে খেলতে গেছে, তারা ফেরা পর্যন্ত অন্ততঃ অপেক্ষা করুক ইনজামাম। তরুণ দে তখন কোচ ইস্টবেঙ্গলের সেই বয়সভিত্তিক টিমটার। তিনি ফিরে আসার পর ট্রায়াল হল। প্রায় ৪৪ জনের মধ্যে থেকে মাত্র দুজনকে বেছে নিয়েছিলেন তরুণ দে। সেই দুজনের একজন হল ইনজামাম। 


ইস্টবেঙ্গলের হয়ে আন্ডার নাইন্টিন কলকাতা লিগ, আই এফ এ শিল্ড এমনকি আই লিগও খেলে ফেলল ইনজামাম। স্বাভাবিক নিয়মেই একদিন এইসব বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে খেলার বয়স পার হয়ে গেল। এবার কী করবে সে? ভবানীপুরে সই করল সে, কোচের নাম দেবজিৎ ঘোষ। দেবজিৎ স্যার আজও ইনজামামের ফুটবল ঈশ্বর।ফুটবল শুরুর সেই দিনগুলোতে তরুণ স্যার আর দেবজিৎ স্যারকে পাওয়াটা এক রকমের আশীর্বাদ ছিল বলেই মনে হয়। 


বেশ কয়েক বছর ভবানীপুরে খেলার পরে সেখান থেকে পিয়ারলেস গেল ইনজামাম। এবং সেখান থেকে রেইনবো।রেইনবোর হয়ে আই লিগ টু খেলে ইনজামাম। এবং তারপর ভবানীপুর। সেখানে প্রথমদিন থেকেই প্রথম এগারোয় জায়গা করে নিয়েছিল সে।মহামেডান অফার দিয়েছিল এইসময়, অফারটা দিয়েছিলেন স্বয়ং দীপেন্দু বিশ্বাস। ভবানীপুরের কোচ তখন শঙ্করলাল চক্রবর্তী।ক্লাবকে জানাল ইনজামাম যে মহামেডান তাকে চাইছে, কোচকেও জানাল। শঙ্করলাল বোঝালেন তাঁর ছাত্রকে, এখানে তো তুমি নিয়মিত খেলছ, মহামেডানে গিয়ে সুযোগ পাবে কিনা তা তো নিশ্চিত নয়।ভবানীপুর সেই সময় বেশ ব্যালান্সড টিম --আনসুমানা ক্রোমা, শিল্টন পাল, পঙ্কজ মৌলা, জিতেন মুর্মু...। 


ভবানীপুর থেকে রেইনবো ফিরে এল ইনজামাম। মহামেডান সে বছর আই লিগ খেলেছিল, সেখানে গেলে হয়তো তারও খেলা হয়ে যেত আই লিগ। তবে আই লিগ না খেললেও একটা জিনিস করেছে ইনজামাম, যা খুব কম বাঙালি ফুটবলারই পেরেছে। কেরালা সুপার লিগ খেলেছে ইনজামাম। সেটাও পরপর দু বছর। কী ভাবে? চিরাচল সত্যান সাবিথকে মোহনবাগান সমর্থকদের ভোলা উচিত নয়। ২০১৪-- ১৫ এর আই লিগ জয়ী দলে ছিলেন কেরালা এবং কর্ণাটক দু রাজ্যের হয়েই সন্তোষ ট্রফি খেলা এই স্ট্রাইকার। রেইনবোর হয়ে খেলতে এসেছিলেন সাবিথ এবং ইনজামামাকে খুব পছন্দ হয়ে যায় তাঁর। কেরালা সুপার লিগের ইতালিয়ান কোচ জিওভান্নি স্কানু তখন সাইড ব্যাক খুঁজছেন, এমন সাইড ব্যাক যে দু দিকেই খেলতে পারবে, যার দুটো পা-ই চলে। সাবিথ নিয়ে গিয়েছিলেন ইনজামামকে। স্কানুর খুবই পছন্দ হয়ে যায় খড়িবাড়ির ছেলেকে। পরপর দু মরশুম ত্রিশূর ম্যাজিকের হয়ে খেলা হয়ে গেল ইনজামামের। 


ফুটবলে হয়তো ওইভাবে রেটিং হয়না কিন্তু গত কয়েকবছরের কলকাতা লিগের সেরা সাইড ব্যাকদের নাম লিখতে বসলে অবধারিত ভাবে ইনজামামের নাম উঠে আসবে। ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে চলেছে ছেলেটা। আধুনিক সাইড ব্যাক মানে তাকে ব্যালান্সড হতে হবে। ইনজামাম এই জায়গাটায় অন্যদের থেকে এগিয়ে। তেল খাওয়া মেশিনের মতো ওঠানামা করে সে। এবং অসাধারণ ক্রস পাঠায়। গত সি এফ এলে মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গল দুটো দলকেই হারিয়েছিল পুলিশ অ্যাথলেটিক,  ইনজামামের বর্তমান ক্লাব। মোহনবাগান ম্যাচে আমিল নাঈমের গোলটায় অবদান ছিল ইনজামামের। ভালো দলগুলোর সঙ্গে জিতলেও লিগ টেবিলের নিচের দিকের দলগুলোর বিরুদ্ধে পয়েন্ট হারায় পুলিশ অ্যাথলেটিক। তাই আর সুপার সিক্সে যাওয়া হয়নি তাদের। 


এ বছরেও পুলিশ অ্যাথলেটিকের হয়েই সি এফ এল খেলবে ইনজামাম, যদি না বড় কোনো অফার পায়। হ্যাঁ, এখনো স্বপ্ন দেখে ইনজামাম, বড় মঞ্চে খেলার স্বপ্ন। এই স্বপ্নটাকে ছোঁয়ার জন্য তার স্বপ্ন -- উড়ান অব্যাহত! এখনো পর্যন্ত!

Powered by Froala Editor