|| স্বপ্ন দেখানো প্রতিভারা পর্ব ২ ||
আনন্দ চক্রবর্তীকে বাগনানের আশপাশের সবাই চেনে, চেনেন কলকাতা ময়দানের ছোট ছোট ক্লাবের কর্মকর্তারাও। কলকাতা ময়দানকে ফুটবলার সরবরাহ করার কাজটা নিয়মিতভাবে করে চলেছেন তিনি। চন্দ্রভাগ কোচিং সেন্টার তিনিই চালান। কিছুদিন প্র্যাক্টিস করার পর ছেলেটিকে মনে ধরেছিল তাঁর। কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে আনন্দ জানতেন এরা সব অতি নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে। ছোট বয়সেই রুজি রোজগারের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। তিনি এই ছেলেকে গড়েপিটে তৈরি করার পর এ হয়তো চলে যাবে ফুটবল ছেড়ে অন্য কোনো কাজ করতে। তাই তিনি ছেলেটিকে বললেন, বাবাকে ডাক, কথা বলব। ছেলেটি বাবাকে ডাকে বাপি বলে। বাবা এলেন, পেশায় বাসের হকার তিনি। আনন্দ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ছেলেকে ফুটবল খেলাবেন? ওর মধ্যে প্রতিভা আছে। নিজের হাজার অভাব আর কষ্ট চেপে রেখেও বাবা বললেন খেলুক।
এইইই হল ফুটবলার সুদীপ কুমার দাসের ফুটবল মাঠে আসার গল্প। নিজের বাড়ি মেদিনীপুর জেলার মিলননগরে। কিন্তু সুদীপ বড় হয়েছে মামাবাড়িতে, দাদু দিদার কাছে। বাগনান থেকে সাত -- আট কিলোমিটার দূরের পাটুল গ্রামে।ছোটবেলায় পাড়ায় খেলত, ঝন্টুদা বলে একজনের চোখে পড়ায় তিনিই পাঠিয়েছিলেন আনন্দ চক্রবর্তীর কাছে। ওই যে নিজের অভাব চেপে রেখেও বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ফুটবলটাই খেলুক। শুধু বাবা নন, দাদু -- দিদা, মানে যাঁদের কাছেই বড় হয়েছেন সুদীপ তাঁরাও ক্রমাগত পাশে থেকেছেন সুদীপের। মা -- বাবার পাশাপাশি তাঁদের অবদান ভুলতে পারে না সুদীপ। দিদা তাকে বুট কিনে দিয়েছেন। এমনকি ছোট ভাই সৌমেন দাসও চেয়েছে বরাবর যাতে দাদা ফুটবলার হয়। এখন মুম্বাইয়ে কাজ করে সৌমেন, সুদীপের নিজের কথায়, আমার জামাপ্যান্ট, ফুটবল বুট সব কিছু ভাইই কিনে দেয়, এখনও।
মাধ্যমিক দেওয়ার পর ইস্টার্ন রেলের আন্ডার নাইন্টিন টিমে খেলার জন্য গিয়েছিলেন, নির্বাচিত হয়েও খেলা হয়নি " পক্স " হওয়ার জন্য। ময়দানের প্রথম ক্লাব ফার্স্ট ডিভিশনের সুবার্বন। কোচ ছিলেন তড়িৎ ঘোষ। বাচ্চা ছেলেটাকে অভিজ্ঞ কোচ ক্রমাগত জিজ্ঞাসা করতেন, হ্যাঁ রে বাবা পারবি তো? আর ছেলেটা প্রতিবার বলত --- হ্যাঁ স্যার! পারব। সুবার্বন থেকে জর্জ টেলিগ্রাফে গিয়ে ট্রায়াল দিয়েছিলেন সুদীপ, কোচ ছিলেন বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য। সুদীপকে পছন্দ হয় তাঁর কিন্তু সুবার্বন রিলিজ দেয়নি। অতএব সে বছর পুরনো ক্লাবেই খেলতে হয়। সুবার্বন থেকে ভবানীপুর। কোচ দেবজিৎ ঘোষ। ৭০ -- ৮০ জনের মধ্যে থেকে ট্রায়াল দিয়ে সুযোগ পান সুদীপ। কিন্তু তার কপাল খারাপ। সে বছরই মোহনবাগান থেকে ভাবানীপুরে এলেন মণিশ ভার্গব। অতএব সুদীপের ফার্স্ট ইলেভেনে ঢোকা অসম্ভব। দেবজিৎ ঘোষ নিজেই সুদীপকে পাঠালেন পুলিশ এ সি -- তে। কোচ সৌরেন দত্ত। নিয়মিত খেলল সুদীপ। সেখান থেকে এল পিয়ারলেস। কোচ ফুজা তোপে। তমলুকে তাম্রলিপ্ত কাপ দেখে সুদীপকে পছন্দ করে দলে নেন নাইজেরিয়ান কোচ। এবং মহামেডান ম্যাচে উইঙ্গার হিসাবে নামিয়ে দেন সুদীপকে। আদতে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার সুদীপকে উইঙ্গার এবং উইথড্রয়াল ফরোয়ার্ড হিসাবেও ব্যবহার করেছিলেন ফুজা তোপে।
পিয়ারলেসে পরের বছর কোচ হয়ে এলেন বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য। সে বছর কলকাতা লিগের প্রিমিয়ার ডিভিশনে রানার্স আপ হয় পিয়ারলেস। এখানে এসে আরেকজনকে পেয়েছিল সুদীপ। সৈয়দ রহিম নবি! সুদীপের " নবিদা! " বাগনানের অঞ্চল লিগে লালদা ( লালকমল ভৌমিক ), নবিদারা যেতেন খেলতে।সুদীপও খেলেছে সেখানে।সুদীপকে দেখেই নবির সকৌতুক প্রশ্ন, তুই এখানে এলি কী করে? নবিদা নানা ভাবে সাহায্য করেছেন সুদীপকে। পিয়ারলেস থেকে ইস্টার্ন রেল। কোচ প্রশান্ত চক্রবর্তী। এবং প্রশান্ত স্যারের কাছেও আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে সুদীপ। প্রশান্তই খোঁজ নিয়ে তাকে পাঠিয়েছিলেন পুলিশে একটি চুক্তিভিত্তিক কাজের সন্ধান দিয়ে। সেদিনই ছিল লাস্ট ডেট ফর্ম জমা দেওয়ার। প্রশান্ত স্যার না বললে সুদীপ জানতেই পারত না কাজের কথা।
গত দু বছর পুলিশেই আছেন সুদীপ কুমার দাস, জার্সি নাম্বার চোদ্দ। সুদীপকে যদি মন দিয়ে দেখেন কিছুক্ষণ তাহলে চমকে উঠতে পারেন। চমকে উঠতে পারেন যদি আপনি একদা ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে খেলে যাওয়া আরেক চোদ্দ নাম্বারকে দেখে থাকেন। ২০০৭ সালে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের অধিনায়ক ছিলেন এই চোদ্দ নম্বর! চন্দন দাস। পদবী এক এটা ছাড়াও প্লেয়িং স্টাইলেও বজবজের চন্দনের সঙ্গে অদ্ভুত মিল বাগনানের সুদীপের। সেই লম্বা পাস খেলার দক্ষতা, সেই যেখান সেখান থেকে দূরপাল্লার শট নেওয়ার ক্ষমতা! গত বছরের লিগে রেলওয়ে এফ সির বিপক্ষে ওরকম একটা দূরপাল্লার শটে গোল ছিল সুদীপের। জর্জ টেলিগ্রাফ ম্যাচেও দারুণ খেলে সে।গত কলকাতা লিগে চ্যাম্পিয়ন হলেও ইস্টবেঙ্গল পুলিশ এ সি -- র কাছে হেরে গিয়েছিল। সে ম্যাচে একটা গোলের ক্ষেত্রে অ্যাসিস্ট ছিল সুদীপের।
বি এস এল মানে বেঙ্গল সুপার লিগেও দারুণ পারফর্ম করেছে সুদীপ। তাঁর দল মেদিনীপুর খুব ভালো ফল না করতে পারলেও সে বারবার চোখে পড়েছে। দুটো ম্যান অফ দা ম্যাচ পেয়েছেন বি এস এলে --- জে এইচ আর মালদা এবং বর্ধমানের বিপক্ষে। গোলও করেছে বি এস এলে। সেই তার ট্রেডমার্ক দূরপাল্লার শটে। আনন্দ চক্রবর্তীর পাশাপাশি ইন্দ্রনীল চ্যাটার্জীর কাছেও কৃতজ্ঞ সুদীপ। এঁরা না থাকলে সুদীপ দাসকে চিনতো না কেউ, বলছে সুদীপ নিজেই। পুলিশ এ সি -- তে " সুমনদা " পাশে থেকেছেন অনবরত।
অনেক বছর হয়ে গেল কলকাতা লিগে। তবুও অবহেলিত সুদীপ দাস। আসন্ন কলকাতা লিগে চোখ রাখুন এই ছেলেটার দিকে। সেই পুরনো দিনের " ওল্ড স্কুল " ফুটবলের গন্ধ পাবেন। বল স্ন্যাচ করা,লম্বা পাস খেলা এবং তারপরেই দ্রুত ওপরে উঠে যাওয়া এবং ক্রমাগত দূরপাল্লার শট। সুদীপের খেলা দেখে আপনার মনে হতেই পারে --- এ ছেলেটা বড় দলের নজরে কেন পড়ল না! সুদীপ অবশ্য ওসব নিয়ে আর ভাবে না। তার লক্ষ্য ক্রমাগত ভাল খেলে যাওয়া। বাকিটা ফুটবল ঈশ্বরের হাতে।
Powered by Froala Editor
